শিরোনাম : চর্যাপদ
(বাংলা গানের আদিমাতা কাআ আদিমাতা, কাআ তরুবর)
বিষয় : স্বরলিপি
লেখক : আলীম মাহমুদ
প্রকাশক : খড়িমাটি
প্রচ্ছদ : সংগীত বড়ুয়া
দ্বিতীয় সংস্করণ : ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৪৬৭
দেশ : বাংলাদেশ
ভাষা : বাংলা
ISBN : 978-984-8241-87-5
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে আজ আর কোনো বিতর্কই নেই। আবিষ্কারের (১৯০৭) নয় বছর পর যখন এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় (১৯১৬) তখন আবিষ্কারক-সম্পাদক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দুটি সিদ্ধান্তের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তা হলো: এ পদগুলো হাজার বছর আগে অর্থাৎ দশম শতাব্দে রচিত এবং এর ভাষা বাংলা। এই দুটি বিষয় নিয়ে পরে অনেক আলোচনা-বিতর্ক-গবেষণা হলেও এর প্রাচীনত্ব ও বাংলা ভাষার দাবি অস্বীকৃতি লাভ করেনি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের চারশ বছরের শাসনামলে (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দ) বাংলাভাষী এ অঞ্চলের রাজনীতিক -আর্থনীতিক -সাংস্কৃতিক পরিবেশ যখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল তখনই বাংলা ভাষা ও এর প্রথম সাহিত্য-নিদর্শনের সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছিল। এই দীর্ঘ কালপরিসরে শাসকরা যেমন ছিলেন পরমতসহিষ্ণু তেমনি শিক্ষা বিস্তারে অনলস আগ্রহী। এ কালপর্বে প্রতিষ্ঠিত বিহারগুলো শুধু ধর্মাচার ও ধর্মশিক্ষা চর্চায়ই নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখেনি, জ্ঞানানুশীলনেরও গুরুত্বপূর্ণ পাদপীঠ হয়ে উঠেছিল। এসব বিহারের উন্নত শিক্ষায় আকৃষ্ট হয়ে দূরবর্তী ভিন্নভাষী অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীদের এখানে আগমনের কথাও জানা যায়। সুতরাং চর্যাপদ সৃষ্টির অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবেশটিও একান্তভাবে স্মরণীয়।
একথা অনস্বীকার্য যে, বৌদ্ধ সহজিয়া মতাবলম্বী সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদগুলো ধর্মীয় সাধনসংগীত হিসেবেই রচিত হয়েছিল। সাধনায় সিদ্ধিলাভের বা নির্বাণলাভের গূঢ়সব পথের নিশানা রূপকাকারে ব্যক্ত হয়েছে এসব পদে। রূপকের একটি ঘন বাতাবরণ সৃষ্টির অভিপ্রায়েই রচয়িতাদের অভিজ্ঞতায় ধৃত সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ এতে সংযুক্ত হয়েছে। ফলে এসব পদ হয়ে উঠেছে তৎকালীন সমাজনিরীক্ষণেরও এক বাস্তব দর্পণ বা সমাজবাস্তবতারও এক অসামান্য দলিল। দ্বিতীয়ত, রূপক সৃষ্টির পরিকল্পনায় কাব্যের অন্যান্য অলংকারেরও সংশ্লেষ ঘটায় এ পদগুলো নিশ্চিতভাবে হয়ে উঠেছে কাব্যগুণান্বিত ও সাহিত্যরসমণ্ডিত। কোথাও কোথাও লক্ষণীয় ভাবের সুগভীর দ্যোতনা ও এর ভাষার ওজস্বিতা গুণ। তৃতীয়ত, উল্লেখযোগ্য এর সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য। এসব পদের সংগীতধর্মের পরিচয়টি বিধৃত হয়ে আছে প্রতিটি পদের শুরুতে প্রদত্ত রাগের নামোল্লেখে। কিন্তু চর্যাপদের এই দিকটি নিয়ে আলোচনা-গবেষণা তেমন অগ্রসর হয়নি।
চর্যাপদের এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক আলীম মাহমুদ দীর্ঘকাল যাবৎ ব্যাপক গবেষণায়রত আছেন। তিনি এর শীর্ষদেশে উল্লিখিত রাগগুলোর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন। নামাঙ্কিত রাগের অপরিচিতিকে যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিচিত করে তুলেছেন। তিনি প্রতিটি পদের ছন্দ বিশ্লেষণসহ এর স্বরলিপি তৈরি করেছেন। সেইসঙ্গে এসবের ভিত্তিতে বাস্তবে চর্যাপদগুলোকে সংগীতাকারে পরিবেশনের উপযোগী করে শ্রোতাসম্মুখে উপস্থিত করেছেন। বহু বছরের বিপুল শ্রম, একান্ত মনোযোগ ও ব্রতচারী নিষ্ঠা নিয়ে তিনি চর্যাপদকে 'বাংলা গানের আদিমাতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর হয়ে এ গ্রন্থ রচনা করেছেন। চর্যাপদের সাংগীতিক রাগ-সম্পর্কিত ব্যাখ্যা কিংবা এর স্বরলিপি তৈরির বিষয়টি কতটা যথাযথ বা মানোত্তীর্ণ হয়েছে সে-সম্পর্কে মন্তব্য করার উপযুক্ত জ্ঞান বা অধিকার আমার নেই। সুতরাং তাঁর দাবি বিদগ্ধজন কর্তৃক স্বীকৃতিলাভের মাধ্যমে পরিণামে প্রতিষ্ঠা পাবে কি না সে-সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। আমি শুধু দীর্ঘকাল যাবৎ এ নিয়ে তাঁর আন্তরিক শ্রমঘন গবেষণা-শিহরিত চিত্তের আবেগময় উত্তাপের স্পর্শ পেয়ে আসছি। তাতে একথা বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন নিয়ে তাঁর এই সনিষ্ঠ সততামণ্ডিত শ্রম বৃথা যাবে না।
.
ড. সৈয়দ আজিজুল হক
প্রফেসর ও চেয়ারম্যান
বাংলা বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আলীম মাহমুদ গত শতকের ষাটের গোড়ায় জন্মেছেন টাঙ্গাইল জেলার সখিপুরে। বিসিএস করেছেন শিক্ষায়। বিভিন্ন স্কুল- কলেজ-দাতব্য চিকিৎসালয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং অধ্যাপনা ও শিক্ষা প্রশাসন চালাতে গিয়ে লিখতে পেরেছেন অল্পই। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। তার উল্লেখযোগ্য রচনা সুন্দর মেখেছে ছাইভস্ম (কাব্য), গহন মায়ার ছলনা (উপন্যাস), বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে শত গীতের অর্ঘ্য। তিনি চর্যাপদের কাজের জন্য টাঙ্গাইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদকে ভূষিত হয়েছেন ২০১৮ সালে।