শিরোনাম : দেশের গান জাগরণের গান
বিষয় : গান
সংকলন ও সম্পাদনা : শাহরিয়ার খালেদ
প্রকাশক : খড়িমাটি
প্রচ্ছদ : মনিরুল মনির
প্রথম সংস্করণ : ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৭৬
দেশ : বাংলাদেশ
ভাষা : বাংলা
ISBN : 9789848241721
সংগীত মানুষের মনের খোরাক। মনের আরাম, প্রাণের অনুপম সঙ্গী। গানের তাল-লয়-বাণী যেমন ভালো লাগা ও অমিয় আনন্দের প্রলেপ বুলিয়ে দেয়, তেমনি সুরের ইন্দ্রজাল-আবেশ-আবেগ-উদ্দীপনার মন্ত্র মানুষকে জাগিয়ে দেয়, প্রাণিত করে, প্রাণের পিদিম প্রজ্জলিত করে সংগীত যুগে যুগে কালে কালে দেশে দেশে।
সঙ্গীতের এই জাদুকরী ক্ষমতা ও প্রভাব পরিলক্ষিত। একসময় যুদ্ধযাত্রায় অগ্রবর্তী সেনাদলের সম্মুখভাগে গায়ক বা দল উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশন করতেন।
বাংলা সংগীতের ইতিহাসে দেশের গান, জাগরণের গান-এর সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। বাংলার রাখাল ছেলে যখন বটের ছায়ায় বসে, কিংবা মাঝি দাঁড় বেয়ে নিজেদের বঞ্চনার বেদনা বা মহাজন জোতদারের শোষণের কথা গেয়ে গেয়ে মনের কষ্ট হালকা করতে চায়, জীবন-যন্ত্রণার ভার লাঘবে প্রবৃত্ত হয়; তখন বিনোদন ও প্রতিবাদ একাকার হয় সুরে সুরে।
গণজাগরণমূলক দেশের গান, গণসংগীত অভিধায় চিহ্নিত সংগীতের এই ধারার সমৃদ্ধ ও গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির আদি পর্ব যাত্রাপালা। গ্রাম বাংলার প্রান্তিক মানুষের বিনোদনের এক মঞ্চশৈলী ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ।
ওই যাত্রাপালায়ও গণসংগীতের ব্যবহার হতো শিল্পিত পরিসরে। মুকুন্দরাম দাশের 'ভয় কি মরণে...' এই ধারার একটি মাইলফলক। এর ধারাবাহিকতায় বাংলা ও বাঙালির সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্টে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছে গণসংগীত। কতো মুক্তিযোদ্ধাই না 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি'- এই গানের আবেদনে উদ্দিপিত-উজ্জীবিত বা তাড়িত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মহান ব্রতে যুদ্ধের ময়দানে শামিল হয়েছিলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গীত সুষমায় এরকম রয়েছে আরো অনেক অনেক কালজয়ী গান।
পক্ষান্তরে, এই জনপদের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে, দ্রোহে-বিপ্লবে সংগীত অমোঘ মন্ত্রের ভূমিকা পালন করেছে। সেই বৃটিশ আমলের উপনিবেশিত শাসনে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মন নাড়া দেয়নি কি 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি...' কিংবা মহাত্মা গান্ধীর বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা- 'মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই'- এই আহ্বানে কোন্ বাঙালি দেশপ্রেমে আবিষ্ট হননি।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্র লাল, রজনীকান্ত- বাংলা গানের এই পঞ্চপাণ্ডব রচিত দেশের গান বা জাগরণী গান আজ চিরায়ত গান হিসেবে সমধিক খ্যাত। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'-এই মন প্রাণ আকুল করা বাণী বুকের নিভৃত কন্দরে স্থান করে নেয়- অলক্ষ্যে চোখ ভিজিয়ে দেয়। কবিগুরুর রয়েছে এ ধারার অজস্র গান। নজরুলের সেই উচ্চারণ আমরা কীভাবে বিস্মৃত হই- 'এ কী অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী...'
বাংলা ও বাঙালিরা আত্মপরিচয় বা আত্মজাগরণের প্রথম সূতিকাগার ৫২'র মহান একুশের ভাষা আন্দোলন। রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের মহান আত্মোৎসর্গের যে ইতিহাস সৃজিত হয়েছিলো ঢাকার রাজপথে, তাঁদের স্মরণে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ও আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...' গান প্রতিটি বাঙালিকেই আবেগে আপ্লুত করে। গণসংগীতের শিল্পী আবদুল লতিফ সুরারোপ করে নিজেই গেয়েছিলেন- 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়...'।
খুলনার লোককবি শামসুদ্দীন আহমেদ লিখেছিলেন- 'রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি/ তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি...'; এই হৃদয় ব্যথিত করা বেদনাবিধুর গানের সুরকার ছিলেন একাত্তরের শহীদ আলতাফ মাহমুদ।
স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আমাদের এই উদ্যোগ। মহান বঙ্গবন্ধু ছিলেন শিল্প ও সাহিত্যমনস্ক। রবীন্দ্র সঙ্গীত ছিলো তাঁর খুব প্রিয়। তাঁর প্রতিটি অনুষ্ঠানে শিল্পীদের কণ্ঠে গীত হতো 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...' আর পরবর্তীতে যেটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্ধারিত হয়।
মহান মহান একুশের পটভূমি নিয়ে রচিত হয়েছিলো- 'সালাম সালাম হাজার সালাম, শহীদ ভাইয়ের স্মরণে...' গানটি। এই গান যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে শহীদদের স্মৃতিময় আত্মদানকে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিলো অনেক অনেক কালজয়ী গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান। 'ভেবো না কো মা তোমার ছেলেরা হারিয়ে গিয়েছে পথে, ওরা আছে মাগো হাজার মনের বিপ্লবী চেতনাতে...' বা 'নোঙর তোল তোল/সময়টা হলো হলো/ নোঙ্গর তোলো তোলো...' কিংবা 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল, রক্ত লাল...' এ রকম অজস্র গান আজ আমাদের জাতির চেতনার স্মারক। মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অনিঃশেষ অলৌকিক অনুপ্রেরণা। পাকিস্তানি হায়েনাদের কারা প্রকোষ্ঠে বন্দি, মৃত্যুর প্রহর গোণা অমিত বিক্রমের অধিকারী হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ওই অগ্নিগর্ভ সময়ে রচিত হয়েছিলো সেই অমর গানসমূহ 'শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রনি,...' কিংবা 'মুজিব বাইয়া যাওরে'।
এই প্রযুক্তি শাসিত ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্মের চিন্তা চেতনা ধ্যান ধারণা মানস ভিন্নতায় আবর্তিত। বিশ্বায়নের খোলা জানালায় আজ তরুণকুল শেকড়চ্যুত কিংবা মূলবিস্মৃত হওয়ার পর্যায়ে। আমাদের সেই উত্তরাধিকারের দুয়ার বাংলা ও বাঙালির গৌরবের অমর অধ্যায়, দেশের গান জাগরণের গান, পরিচিত করার জন্য আমরা ব্রতী হয়েছি। মুজিব জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বিষয়টি অনিবার্যভাবে প্রাসঙ্গিক। পাঠক সমাজ আমাদের এই নিবেদন সাদরে গ্রহণ করলেই প্রাণিত হবো। আমরা আশা করছি আমাদের এই উদ্যোগ সার্থকতার চূড়ো স্পর্শ করবে।
সংগীত সুষমার অমর চিরকালীন শ্রোতাপ্রিয় জননন্দিত জেগে ওঠা ও উদ্দীপনার প্লাবন সৃষ্টিকারী বেশ কিছু গান নিয়ে মুজিব জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে 'দেশের গান জাগরণের গান' শিরোনামে এই বইয়ের প্রকাশনায় সহযোগিতা করেছেন দেশের অন্যতম শিল্প উদ্দোক্তা প্রতিষ্ঠান জি পি এইচ ইস্পাত। এ মহান কর্ম সম্পাদনে প্রকাশনা সহায়তায় নির্মোহভাবে এগিয়ে আসার জন্য জিপিএইচ ইস্পাত'কে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
.
শাহরিয়ার খালেদ