মুরগির সিনায় মাংসের ইতিহাস (২০২৫)
বিষয়: উপন্যাস
লেখক: শাহরিয়ার ফরহাদ
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
সংস্করণ: প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩২০
ভাষা: বাংলা
আইএসবিএন: 978-984-99702-5-5
শহর একটা শ্রম বেচা-কেনার বাজার, বিরাট কর্মজীবী হোস্টেল, মুরগির ফার্ম বললেও ঠিক আছে। এইখানে মানুষের নৈর্মিত্তিক লড়াইয়ের গল্পগুলা পুরানা আর বোরিং, কোন গ্ল্যামার নাই। এই শ্রম বেচা-কেনার মধ্যস্থতা করে যে দল, যারা ডেস্ক আর ফাইল সামলায়, যারা বাচ্চার খরুচে শৈশব আর নিজেদের ব্যায়বহুল বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিতে থাকে, সেই দলের একজন হয়ে নিজের পরিচয় আর ঠিকানা তৈরির অনির্বচনীয় বাসনা ব্যক্ত করে গল্প বলতে শুরু করে শরীফ। বাপের জমি বিক্রির টাকায় উন্নয়নবিদ্যা পড়া শরীফ চামে স্বল্প মেয়াদে উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার একটা চাকরিও জুটিয়ে নেয়। শহরের বিশাল এক অচেনা জনগোষ্ঠীর লড়াই আর সুখ দুঃখের অংশীদার হয়ে ওঠা তার চয়েস যদি নাও হয়, টিকে যাওয়াটা তার সাফল্য। আত্মকেন্দ্রিক শরীফের বলার মতো কোন গল্প না থাকলেও, আছে দেখার মতো একটা উদাম গ্রাম্য দৃষ্টি। একদিকে বিদেশী উন্নয়ন গবেষণা সংস্থায় চাকরির দেমাগ আর অন্য দিকে শহরের বস্তিবাসী মানুষের জীবনের লড়াই ও আকাঙ্ক্ষা, তারে জড় আর অজড়ের ডাইলেক্টিকের মধ্যে ফেলে দেয়। এক তর্কবাগিশ বৃদ্ধ মাদ্রাসার শিক্ষকের ফাটমেইট হয়ে মীমাংসিত সকল বিষয়েই পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করে শরীফ। তারও মনে হতে থাকে নর্মেটিভ সকল লেসনগুলা আনলার্ন করতেই চলে যাবে একটা জীবন। নব্য-উদারনৈতিক শহর ব্যবস্থাপনার ক্রুয়েল ফরমুলা সে বুঝতে শুরু করে, শহরের মাটি-পানি-গাছপালা সব দখল করছে ধনী লোকেরা, চাই বা না চাই এই প্রভাব পড়ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আর সম্পর্কে। ঝামেলা এড়িয়ে চলা শরীফ টের পায় যে, রাজনীতি তো আমাদের শরীরে। একজন স্রেফ পর্যবেক্ষকের ভূমিকাতে সে আর থাকতে পারে না, নিজের গল্পের নায়ক হয়ে উঠতে চায়। এই হয়ে উঠতে চাওয়াই গল্পের পরিণতি ঠিক করে দিতে থাকে।
.
সন্ধ্যার আবছায়া অন্ধকারের সময়টাতে ছোটবেলা থেকেই এক অদ্ভুত বিপন্নতা অনুভব করে শরীফ। কেন এমন হয় তার? এই বিপন্নতা তাকে কোথায় পৌঁছে দেবে?
মধ্যবিত্ত নিরুপদ্রপ জীবনে উত্তরিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই যে তাকে মফস্বল থেকে রাজধানীতে নিয়ে এসেছে এ বিষয়ে সে সচেতন। যে জীবনে অনুপ্রবেশে তার চাবি উন্নয়নবিদ্যার একটা সার্টিফিকেট। বিদেশি এনজিওতে একটা অস্থায়ী চাকরিও যোগাড় হয়ে যায় শুরুতেই। তারপরেও নিজের ভেতরে বহন করা সেই বিপন্নতা সে অতিক্রম করতে পারে না।
বরং, সেটা নিয়েই সে মুখোমুখি হয় ক্রমবর্ধমান উন্নয়নমুখর এই শহরের নানামুখী কার্নিভালেস্ক বৈপরীত্যের। মুখ ও মুখোশের সমন্বয়হীন অসংখ্য চরিত্রের। রহস্যময় রাজ্জাক স্যার কি সত্যিই এক সময় চরমপন্থি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? শরীফের সব অভ্যস্ত চিন্তাই কেন মহল্লার মাদ্রাসার এই পৌঢ় ইংরেজির শিক তার 'নিহিলিস্ট' প্রশ্নে ধ্বসিয়ে দিতে চায়?
বস্তির জনব আলি আর কালাচাঁনদের জীবনকে বোঝার সহজিয়া আধ্যাত্মিকতার সামনে শরীফের কাছে অসাড় মনে হয় সব উন্নয়ন তরিকা- সে নিজেই যার জলজ্যান্ত এজেন্ট! একাধারে নিজের আকাঙ্ক্ষিত জীবনের প্রতি লোভ এবং সন্দেহ নিয়ে সে কি তার চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারবে? সে কি পারবে মতার রাজনীতির স্থানীয় পান্ডা আইজুদ্দিদের প্রতাপে আক্রান্ত বস্তিবাসীর পাশে দাঁড়াতে?
নাকি তারা সকলেই একই বিপন্নতায় আক্রান্ত? ইতিহাসের একই স্রোতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত? শাহরিয়ার ফরহাদের 'মুরগির সিনায় মাংসের ইতিহাস' শরীফের আত্মবয়ানে ঢাকা নামের এই মেট্রোপলিসের জটিল নেক্রপলিটিক্সের (Necropolitics) গল্প। কিন্তু প্রথাাগত সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাবাদি ভঙ্গিমার বদলে যা উন্মোচিত হয়েছে লেখকের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর হিউমার মিশ্রিত জোকোসিরিয়াস (Jocoserious) ভঙ্গিমায়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের জন্য এই উপন্যাস ধারণ করে আছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
..
তৌহিদুল ইসলাম
.
শাহরিয়ার ফরহাদ
ফ্যালফ্যাল করে মানুষ দেখতে থাকা আর পাবলিক স্পেইসে আলাপ শুনতে থাকা শাহরিয়ার ফরহাদের স্বভাব। এই স্বভাব দোষেই তিনি দৈনন্দিন জীবনের গল্প আর ফটো সংগ্রহ করে থাকেন।
ভারবাল এক্সপ্রেশনিস্ট (Verbal expressionist) ফরহাদ
বন্ধু আর পরিচিত মহলে গল্প-আড্ডায় প্রচুর কথা বলেন। সুযোগ পেলেই তিনি নিজের গল্প শোনাতে চান। বেশি বলতে গিয়ে কম লিখতে পারেন। নৃবিজ্ঞান ও পাবলিক পলিসি বিষয়ে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন। এই সার্টিফিকেট কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন গবেষণায় বিভিন্ন মেয়াদে কাজ-বাজ করে খোরাকি সংগ্রহ করে থাকেন।
কাজের সূত্রেই দেশের বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের সাথে আলাপ করার সুযোগ পান। গল্প বানাতে এই সকল অভিজ্ঞতা তাকে সহায়তা করে। কথা বলার মানুষ কমে গেলে তিনি বই পড়েন বা সিনেমা দেখেন। টেকনোলজির খোঁজ রাখেন মূলত কম বয়সী পোলাপানের সাথে আলাপ জমানোর জন্য। নিয়মিত লিখতে চান এবং আরো অনেক মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চান।